কাগজে ১১০ শিক্ষার্থী, বাস্তবে একজনও নেই! শ্রেণিকক্ষে ছাগলের ‘ক্লাস’
স্কুল আছে, শিক্ষক আছে—নেই শুধু শিক্ষার্থী; শ্রেণিকক্ষে ছাগলের বসবাস
স্কুল আছে, শিক্ষক আছে—নেই শুধু শিক্ষার্থী; শ্রেণিকক্ষে ছাগলের বসবাস
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
স্কুল আছে, শিক্ষক আছে, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীও আছে শতাধিক। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয়ে নেই একজন শিক্ষার্থীও। শিক্ষার্থীদের যেখানে শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করার কথা, সেখানে নিয়মিত বসে ছাগল। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে ছাগলের মলমূত্র, কাদামাটি, ময়লা-আবর্জনা ও মাকড়সার জাল। হোয়াইট বোর্ডে লেখা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পাঠের চিহ্ন। এরপর আর সেখানে কোনো ক্লাস হয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কথাগুলো শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে এমনই চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী রয়েছে ১০০ জনের বেশি। তবে সরেজমিনে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি দুপুর ১১টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ। অফিস কক্ষেও ঝুলছে তালা। বাইরে টাঙানো রয়েছে জাতীয় পতাকা। শ্রেণিকক্ষগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। বেঞ্চের ওপর ও শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র। বেঞ্চে জমে আছে কাদা ও ময়লা। শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন স্থানে মাকড়সা জাল বুনে রেখেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য থাকা শ্রেণিকক্ষগুলোতে ছাগলের অবাধ বিচরণও চোখে পড়ে। যেন বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষই হয়ে উঠেছে ছাগলের আশ্রয়স্থল। শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সাল লেখা রয়েছে। এতে ধারণা করা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কোনো একসময় বোর্ডে লেখা হয়েছিল। এরপর আর সেখানে পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চলতি বছর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হয়নি বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। সকাল গড়িয়ে দুপুর ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ত ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর তারা তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ফোন করে জানান, সাংবাদিক বিদ্যালয়ে এসেছেন এবং তাদের বিদ্যালয়ে আসতে বলেন। প্রায় দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাউকেই তখন বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি। পরে অফিস কক্ষে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে তারা জানান, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের ঘরে রাখা রয়েছে। এরপর সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান তারা। একপর্যায়ে সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধাকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমন দশা আজকের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে বিদ্যালয়টি চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় কোনো ছেলে-মেয়ে এ বিদ্যালয়ে পড়তে আসে না। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার যেসব ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে না, তাদের টাকার বিনিময়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে অডিট আসলে কিংবা কোনো প্রোগ্রাম হলে মাঝেমধ্যে ঝালকাঠি সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুইটি অটোরিকশায় করে টাকার বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের এনে শিক্ষার্থী দেখানো হয়। এমনকি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময়ও মাঝে মধ্যে বাইরে থেকে ছেলে-মেয়ে এনে তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়।বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবুর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার পরিবারের পাঁচজন সদস্য বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু এবং প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তাদের পছন্দের লোকজন দিয়ে বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করেন। এরপর নিজেদের ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। ঠিকমতো শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করার কারণে মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ের কোনো সভাপতি শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাসিক বেতনের শিটে স্বাক্ষর না করলে তার স্বাক্ষর জাল করে নিজেরাই স্বাক্ষর দিয়ে মাসিক বেতনের টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর বড় ভাই মনিরুজ্জামানের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজ। অর্থাৎ প্রধান শিক্ষক নিজের ভাইয়ের ছেলেকে সভাপতি বানিয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সভাপতি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসে বাসায় বসেই স্বাক্ষর করেন এবং প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয় আরাফাত, আসমা বেগমসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, বিদ্যালয়ে মাঝে মধ্যে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা আসে। এছাড়া অন্য সময়ে শিক্ষার্থীদের দেখা যায় না। তবে ছাগল সবসময় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে আসে এবং বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। শিক্ষকরাও প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন না; মাঝেমধ্যে আসেন।
পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস বলেন, ২০০৬ সালের দিকে তাকে ওই বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে গেলে শিক্ষকরা পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে রাখতেন। একদিন কাউকে না জানিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি দেখেন, স্কুল তালাবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তার স্বাক্ষর জাল করে মিটিংয়ের রেজুলেশন তৈরি করে সরকারের কাছ থেকে অনুদানের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে ওই অনুদানের অর্থ উত্তোলনের সময় বিষয়টি তার কাছে ধরা পড়ে। হাসনাইন তালুকদার দিবস বলেন, সব মিলিয়ে তাদের সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়টি বুঝতে পেরে তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। একই অভিযোগ করেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। তিনি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাকে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়। তখন তিনি মঠবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না, ক্লাসও হতো না। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না। তিনি বলেন, এরপর শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়দের নিয়ে মিটিং করেন। তখন তিনি সবাইকে বলেন, আপনারা যদি বিদ্যালয়ে ঠিকমতো ক্লাস না নেন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করেন, তাহলে তাকে সভাপতি বানানো হয়েছে কেন? তার ভাষ্য, তাদের কথায় তিনি বুঝতে পারেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তাকে সভাপতি করা হয়েছিল, যাতে তিনি তাদের আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, তিনি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমেও চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা কারও কথা না শোনায় বাধ্য হয়ে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই ২০১৫ সালে পদত্যাগ করেন।
পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ওরফে পারভেজের কাছে বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না। আপনি আমার কাছে না বলে কেনো স্কুলে গেছেন? স্কুলে শিক্ষকরা আসে বা ক্লাস হয় নাকি আপনি গিয়ে স্কুলে বসে থাকেন।” বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনের শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষর করেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মানুষ বললে কি আমার বাল ছেড়া যায়। আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না, আমার ডিসি আছে, শিক্ষা অফিসার আছে, তাদের কাছে বলবো।”
পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না এলেও কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে ক্লাস করানো হয়।
জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটারের বেশি দূরে বিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও কেন শহর থেকে শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয়-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, “স্থানীয় ৪/৫ জন আসে, আর কেউ আসে না। যার জন্য ঝালকাঠি থেকে নিয়ে আসি।”
রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়ের বিষয়টি জানতে পেরে প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহ তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এবং প্রধান শিক্ষকের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হলে পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে বিদ্যালয়ের কাগজে-কলমে শতাধিক শিক্ষার্থী, অন্যদিকে বাস্তবে একজন শিক্ষার্থীরও উপস্থিতি নেই। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে ছাগলের অবস্থান, দীর্ঘদিন পাঠদান না হওয়ার অভিযোগ, বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো, হাজিরা খাতা দেখাতে না পারা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বিদ্যালয় পরিচালিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় করে পরিচালিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রম নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
এখন দেখার বিষয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তদন্ত ও প্রশাসনের পদক্ষেপে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রকৃত চিত্র কতটা সামনে আসে এবং কাগজে-কলমের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী ও সরকারি অর্থের ব্যবহারের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3
কমেন্ট বক্স